শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সংবাদ সম্মেলন
মঞ্জুর:
জ্বালানি খাতে শতভাগ বৈদেশিক মুদ্রার বিনিয়োগ কৃত কোম্পানিতে ৫% শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (WPPF) অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে শ্রম বিধিমালা সংশোধনের সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঢাকা রিপোর্টার ইউনিটি শফিকুল করিম মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মোস্তফা সোহেল ইকবাল, সভাপতি, শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন, মোঃ নুরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক, এস এম সাহরিয়ার আবেদীন, সহ-সভাপতি, মোঃ হারুন আল রশিদ, সাধারণ সম্পাদক, টাল্লো বাংলাদেশ এমপ্লয়ীজ ইউনিয়ন, বাবুল আক্তার প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মোঃ নুরে আলম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (CBEU) ও টাল্লো বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (TBEU) বিদেশি বিনিয়োগকৃত জ্বালানি খাতে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মচারীদের নিবন্ধিত দুটি ট্রেড ইউনিয়ন, যারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের আইনগত অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধা শেভরনের জালালাবাদ, বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার গ্যাস ক্ষেত্র এবং টাল্লোর (বর্তমানে ক্রিস এনার্জি) বানগুরা গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের সিংহভাগ সরবরাহ নিশ্চিত করে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের সর্বাধিক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন ও যোগ্য প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন শাখার স্নাতকরা দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই দেশপ্রেমিক ও মহৎ দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (CBEU) এবং টাল্লো বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (TBEU) বৈদেশিক মুদ্রার বিনিয়োগকৃত জ্বালানি খাতে কর্মরত জাতীয় কর্মচারীদের আইনসম্মত ৫% Workers Profit Participation Fund (WPPF) সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে শ্রম বিধিমালা/শ্রম আইন সংশোধনের অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের প্রতি তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে থাকার সুযোগে এমন একটি সংবেদনশীল ও শ্রমিকস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তড়িঘড়ি করে বিধি সংশোধনের অস্বাভাবিক তৎপরতা শুধু অনুচিতই নয়; বরং এটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে, যার উদ্দেশ্য জাতীয় কর্মচারীদের অধিকার খর্ব করে নির্দিষ্ট কিছু মহল/কোম্পানিকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়া। বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী যোগ্য প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের বার্ষিক নিট মুনাফার ৫% শ্রমিকদের কল্যাণ ও ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে Workers Profit Participation Fund (WPPF)-এ বরাদ্দ দিতে আইনগতভাবে বাধ্য। বাংলাদেশের বহু দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই আইন অনুযায়ী WPPF প্রদান করে আসছে। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহও দীর্ঘদিন ধরে আইন মেনে WPPF প্রদান করছে। উল্লেখ্য যে, বৈদেশিক বিনিয়োগে পরিচালিত তেল ও গ্যাস কোম্পানিসমূহ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের নামে রাষ্ট্রের কাছ থেকে বহুবিধ অতিরিক্ত ও বিশেষ আর্থিক সুবিধা ভোগ করে আসছে। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয়ের উপর শতভাগ (১০০%) কস্ট রিকভারি সুবিধা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সম্পূর্ণ করমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ, এবং সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট আয়কর পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বহন করা। অতএব, শুধুমাত্র বৈদেশিক বিনিয়োগে পরিচালিত তেল ও গ্যাস কোম্পানিসমূহের WPPF প্রদানের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার যে কোনো উদ্যোগ হবে- বৈষম্যমূলক, আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও অবৈধ, শ্রম অধিকার ও ন্যায়বিচারের চেতনার পরিপন্থী, শ্রমিক কল্যাণ ও সমতার ওপর সরাসরি আঘাত, CBEU স্মরণ করিয়ে দিতে চায় যে, ২০২২ সালে শেভরন বাংলাদেশ-এর শ্রমিকগণ ২০১৩ হতে অদ্যাবধি তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশ প্রদানে কোম্পানির ক্রমাগত অপারগতায় মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। উক্ত রিট পিটিশনের শুনানি শেষে মহামান্য হাইকোট বিভাগ গত ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪ ইং শ্রমিকদের পক্ষে রায় দেন এবং রায়ের অনুলিপি প্রাপ্তির ০৩ (তিন) মাসের মধ্যে শেভরন বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় তহবিল গঠনপূর্বক কোম্পানির নিট মুনাফার ৫% (পাঁচ শতাংশ) হারে WPPF পরিশোদের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ শ্রম মন্ত্রণালয়কে উক্ত রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে শেভরন বাংলাদেশ মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একটি আপিল দায়ের করে। পরবর্তীতে উক্ত আপিলটি গত ২৮ অক্টোবর, ২০২৫ ইং শুনানি শেষে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত পূর্ববর্তী রায়ের ওপর কোনো প্রকার স্থগিতাদেশ না দিয়ে আপিলটি নিয়মিত শুনানির জন্য প্রেরণ করেন। অতএব, যেহেতু উক্ত সিভিল পিটিশনটি বর্তমানে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন, সেহেতু এই পর্যায়ে শ্রম বিধিমালা সংশোধনের যেকোনো উদ্যোগ সরাসরি বিচারাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার সামিল। এছাড়াও TBEU-এর তথ্যমতে, তাদের ২০২১ সালে করা WPPF-এর পিটিশনের রায়ও কর্মচারীদের পক্ষে যায়। পরবর্তীতে টালু কোম্পানি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগও ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কর্মচারীদের পক্ষে রায় দেয়। অতঃপর টান্ন কোম্পানি রিভিউ পিটিশন করলে তা এখনো শুনানির জন্য অপেক্ষমান। এই ক্ষেত্রেও বর্তমানে শ্রম বিধিমালার যেকোনো পরিবর্তন বিচারাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল হবে। এছাড়াও, ২০২২ সালে শ্রম বিধিমালায় একটি সংশোধনীর মাধ্যমে ১০০% রপ্তানিমুখী খাতের শ্রমিকদের WPPF থেকে বঞ্চিত করা হয়, যা ব্যাপকভাবে একতরফা ও ন্যায়বিচারবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। আমরা জানতে পেরেছি, উক্ত সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত রিটের প্রেক্ষিতে মাননীয় হাইকোর্ট “এই পরিবর্তন কেন অবৈধ হবে না” সে বিষয়ে রুল নিশি জারি করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে একটি বিচারাধীন বিষয়ে পুনরায় শ্রম বিধিমালায়ে এক ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক, আশঙ্কাজনক এবং আইনগত ও নৈতিকতাবিরোধী। এই প্রেক্ষাপটে CBEU এর সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সংগঠনের আইন উপদেষ্টা গত ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ শ্রম মন্ত্রণালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং WPPF বিষয়ে শ্রম বিধিমালা সংশোধনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানান। বৈঠকে CBEU স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, জাতীয় কর্মচারীদের আইনসম্মত WPPF থেকে বঞ্চিত করার যে কোনো উদ্যোগ হবে বেআইনি এবং তা চলমান বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও আইনি প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। তবে বৈঠকের পরপরই CBEU-এর কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, কিছু অজ্ঞাত ও অস্পষ্ট স্বার্থান্বেষী মহলের অযৌক্তিক চাপের কারণে এই সংশোধনী উদ্যোগ অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উক্ত বিষয়টি ন্যায্যতা প্রদানের উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সম্পর্কে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। CBEU ও TBEU এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও শ্রমিকস্বার্থবিরোধী অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও কঠোর প্রতিবাদ জানান। খুব অল্প সময়ের নোটিশে গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে পেট্রোবাংলা CBEU-কে একটি বৈঠকে ডাকে, যার এজেন্ডা আগে থেকে জানানো হয়নি। CBEU দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয় এবং সদিচ্ছা নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত হয়। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো; একটি শ্রম আইন সংশোধন বিষয়ক বৈঠকে জাতীয় শ্রমিকদের ইউনিয়নের উপস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানকে উপস্থিত রাখা হয়, যা আলোচনার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বৈঠকে CBEU পেট্রোবাংলাকে স্পষ্টভাবে জানায়; জাতীয় কর্মচারীদের আইনসম্মত WPPF অধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে যে কোনো আইনি পরিবর্তন বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য।” সুতরাং, জাতীয় স্বার্থ, ন্যায়বিচার ও আইনগত বাধ্যবাধকতার আলোকে CBEU এবং TBEU জোরালোভাবে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করছে- ১) বিচারাধীন বিষয়ে শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালায় যেকোনো প্রকার পরিবর্তনের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ২) বিদেশি বিনিয়োগকৃত জ্বালানি খাতকে আইনসম্মত ৫% (পাঁচ শতাংশ) WPPF প্রদানের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে শ্রম আইন ও/অথবা শ্রম বিধিমালা সংশোধনের সকল উদ্যোগ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। ৩) জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল শ্রমনীতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পূর্ণ অনুচিত, অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বিবেচনায় এহেন সকল উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অতএব, জাতীয় জ্বালানি খাতের সংবেদনশীলতা ও ভঙ্গুরতা বিবেচনায় CBEU ও TBEU সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চায় যে, আমাদের যৌক্তিক দাবিসমূহ অবিলম্বে বাস্তবায়ন না করা হলে সরকারই আমাদেরকে কঠোর কর্মসূচি ও শক্তিশালী প্রতিবাদ আন্দোলনে যেতে বাধ্য করবে। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের যেকোনো পরিস্থিতি ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের ওপর বর্তাবে। CBEU এবং TBEU পুনরায় ঘোষণা করছে; চাপের মুখে শ্রমিকদের আইনসম্মত অধিকার খর্ব করা যাবে না। জাতীয় শ্রমিকদের নিজ দেশেই দ্বিতীয় শ্রেণির অংশীজন বানানোর ষড়যন্ত্র আমরা বরদাস্ত করব না।”













