মঞ্জুর: Selfie শব্দটি এসেছে ইংরেজি self (নিজে) শব্দ থেকে। এর অর্থ—নিজের তোলা নিজের ছবি, সাধারণত স্মার্টফোন বা ক্যামেরা সামনে ধরে তোলা। ধারণা করা হয় ২০০২ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি অনলাইন ফোরামে প্রথম “selfie” শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সাথে সাথে শব্দটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১৩ সালে Oxford Dictionaries “Selfie” শব্দটিকে Word of the Year ঘোষণা করে এবং একই সময়ে শব্দটি Oxford English Dictionary-তেও আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে সেলফি তোলা যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেছে। কোথাও ঘুরতে গেলেই ছবি, কোনো অনুষ্ঠানে গেলেই ছবি, আবার পরিচিত বা গুরুত্বপূর্ণ কাউকে দেখলেই সেলফি—সবকিছু যেন এখন ক্যামেরাবন্দি করতেই হবে। অনেকের কাছে এটি আনন্দের বিষয়, আবার অনেকের কাছে স্মৃতি ধরে রাখার একটি উপায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সেলফি সংস্কৃতি অনেক সময় অপ্রস্তুত ও বিব্রতকর পরিস্থিতিরও জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাজনীতির মাঠে বিষয়টি এখন বেশ চোখে পড়ে। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা বা কোনো নেতার উপস্থিতি মানেই অনেকের কাছে সেটি সেলফি তোলার সুযোগ। অনেক সময় দেখা যায়, একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বা কর্মসূচির মাঝেই কেউ না কেউ এসে সেলফি তোলার অনুরোধ করছেন। একজন তুললে আরেকজন, তারপর আরেকজন—এভাবে বিষয়টি অনেক সময় একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে। ফলে মূল কর্মসূচির গুরুত্বও অনেক সময় কমে যায়। রাজনীতিবিদদের দিক থেকেও বিষয়টি সবসময় স্বস্তিকর নয়। অনেক নেতা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি ভেতরে ভেতরে বিরক্তবোধ করলেও সেটি প্রকাশ করেন না। কারণ যারা সেলফি তুলতে আসে, তাদের বেশিরভাগই সমর্থক বা শুভাকাঙ্ক্ষী। তারা ভালোবাসা থেকেই এগিয়ে আসে। সরাসরি কিছু বললে তারা কষ্ট পেতে পারে বা ভুল বুঝতে পারে—এই ভাবনা থেকেই অনেক সময় নেতারা হাসিমুখে ছবি তুলতে বাধ্য হন, যদিও সেই মুহূর্তে হয়তো তারা ব্যস্ত বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে চান। আরেকটি বিষয় হলো, অনেকেই এই সেলফিকে পরে ভিন্নভাবে ব্যবহার করেন। একটি সাধারণ সৌজন্যমূলক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ করা হয় যেন ওই ব্যক্তি নেতার খুব ঘনিষ্ঠ বা বিশেষ কেউ। কখনো কখনো সেই ছবিকে কেন্দ্র করে নিজের প্রভাব বা পরিচয় বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এতে অন্যদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু মানুষ এই ছবিগুলো অসৎ উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করে। কোথাও প্রভাব খাটানো, পরিচয় দেখিয়ে সুবিধা নেওয়া, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখানো—এমন ঘটনাও কম নয়। একটি সাধারণ সেলফি তখন হয়ে যায় ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার। এতে শুধু সেই ব্যক্তি নয়, অনেক সময় সংশ্লিষ্ট নেতার ভাবমূর্তিও অযথা জড়িয়ে যায়। শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, সাধারণ সামাজিক জীবনেও একই প্রবণতা দেখা যায়। সময়-পরিস্থিতি না ভেবেই অনেকেই ছবি তুলতে চান। কেউ ব্যক্তিগত আলাপ করছেন, কেউ ব্যস্ত আছেন, কিংবা কোনো সংবেদনশীল পরিস্থিতি—এসব ক্ষেত্রেও অনেক সময় মানুষ সেলফির অনুরোধ করে বসেন। এতে অনেক সময় অপ্রস্তুত অবস্থা তৈরি হয়। আসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরার এক ধরনের প্রতিযোগিতা এখন তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, পরিচিত বা প্রভাবশালী কারও সঙ্গে ছবি তুলতে পারলেই সেটি দ্রুত পোস্ট করতে হবে—যেন সেটিই নিজের গুরুত্বের প্রমাণ। এই মানসিকতা থেকেই অনেক সময় সেলফি বিষয়টি অতিরিক্ত হয়ে যায়। তবে এটাও সত্য, মানুষের ভালোবাসা বা শ্রদ্ধার প্রকাশ হিসেবে সেলফি অনেক সময় সুন্দর একটি স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে। সমস্যা তখনই হয়, যখন সেটি মাত্রা ছাড়িয়ে যায় বা অন্যের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রয়োজন একটু সচেতনতা। কোথায়, কখন এবং কীভাবে ছবি তোলা উচিত—এই বোধটি আমাদের সবার মধ্যেই থাকা দরকার। জনসমাগম বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শালীনতা ও পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করা জরুরি। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, সেলফি তোলা কোনো খারাপ বিষয় নয়। কিন্তু সেটি যেন অন্যের জন্য বিড়ম্বনার কারণ না হয় এবং কোনোভাবেই অপব্যবহারের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে—সেই সচেতনতা আমাদের সবারই থাকা প্রয়োজন।