আলী আহসান রবিঃ
মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল,২০২৬
জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিয়মিতভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শুমারি ও জরিপ পরিচালনা করে থাকে। এর মধ্যে জনশুমারি, কৃষি শুমারি এবং অর্থনৈতিক শুমারি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানিক কার্যক্রমগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক শুমারি। সে বিবেচনায় বিবিএস “অর্থনৈতিক শুমারি-২০২৩” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি পরিচালনা করে। বাংলাদেশে প্রথম অর্থনৈতিক শুমারি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০০১ ও ২০০৩ সালে (দুটি পর্যায়ে) এবং তৃতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ সালে সম্পন্ন হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, বিবিএস কর্তৃক ১০ থেকে ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ সময়ে দেশব্যাপী ৪র্থ অর্থনৈতিক শুমারি পরিচালিত হয়। এ শুমারিতে দেশের প্রতিটি অর্থনৈতিক ইউনিট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আধুনিক Computer Assisted Personal Interviewing (CAPI) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে ইলেকট্রনিক ডিভাইস (ট্যাবলেট) দিয়ে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। শুমারি সমাপ্তির প্রায় এক মাসের মধ্যেই, ২৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে প্রাথমিক প্রতিবেদন (প্রিলিমিনারি রিপোর্ট) প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে Bangladesh Standard Industrial Classification (BSIC) এবং Bangladesh Central Product Classification (BCPC) অনুযায়ী কোডিং, তথ্য বিশ্লেষণ, যাচাই-বাছাই এবং জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ অনুসারে শিল্প ক্যাটাগরিতে বিন্যস্তকরণসহ বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ শেষে ন্যাশনাল রিপোর্ট প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা এযাবৎকালে স্বল্পতম সময়ে রিপোর্ট প্রস্তুত ও প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জনাব মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জনাব মোঃ ফরহাদ সিদ্দিক, মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মিজ আলেয়া আক্তার, সচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং জনাব এস. এম. শাকিল আখতার, সচিব, পরিকল্পনা বিভাগ। এছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা ও অধিদপ্তর থেকে আগত সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও প্রশ্নোত্তর পর্ব সঞ্চালনা করেন অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৩ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড দিপংকর রায়, যুগ্মসচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক জনাব মোঃ মিজানুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনাব মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, একটি দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার হলো নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রমাণনির্ভরতা নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে data-driven planning এবং people-centric economic policy। সেই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর ফলাফল আমাদের অর্থনীতির একটি বিস্তৃত, গতিশীল এবং সম্ভাবনাময় চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪ সালে দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি, যা ২০১৩ সালের তুলনায় প্রায় ৪৯.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই প্রবৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতির সম্প্রসারণ ও বহুমাত্রিক বিকাশের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। পল্লি ও শহর উভয় এলাকাতেই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে পল্লি এলাকায় প্রায় ৭৩.৮৬ লাখ এবং শহরে ৪৩.১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ইউনিটের মধ্যে ৫৩ শতাংশের বেশি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান এবং একটি বড় অংশ মাইক্রো ও কুটির শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে, মাইক্রো শিল্প ৫৬.৬৭% এবং কুটির শিল্প ৩৮.৭৪%, যা আমাদের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি তুলে ধরে।
মিজ আলেয়া আক্তার, সচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ বলেন, আপনারা অবগত আছেন যে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আজ আমরা অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ এর চূড়ান্ত ন্যাশনাল রিপোর্ট প্রকাশ করতে যাচ্ছি। দেশের কৃষি বহির্ভূত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসমূহের সঠিক চিত্র তুলে ধরার লক্ষ্যে এই শুমারি পরিচালিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের সকল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসম্পন্ন খানার সংখ্যা, তাদের ধরন, প্রধান কার্যক্রম, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তৃতি এবং শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ সম্পর্কে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, এই শুমারির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটসমূহের একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে National Statistical System (NSS)-কে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই ডাটাবেজ ও রিপোর্টের তথ্য নীতি নির্ধারক, পরিকল্পনাবিদ, গবেষক, ব্যবসায়ী সমাজ, সুশীল সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা তখনই কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়, যখন তা নির্ভরযোগ্য, বিস্তৃত এবং হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত হয়। অর্থনৈতিক শুমারি সেই তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান উৎস। এই শুমারির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটসমূহের গঠন, খাতভিত্তিক বণ্টন, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক ইউনিটের মালিকানা কাঠামো এবং উৎপাদন ও সেবার বৈচিত্র্য সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এই শুমারির ফলাফল বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, দেশের অর্থনীতি ক্রমশ সেবা খাতনির্ভর হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে, বিপুল সংখ্যক মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করছে। এটি আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। আমাদের উন্নয়ন কৌশল হতে হবে SME ও উদ্যোক্তাবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কর্মসংস্থানমুখী। অঞ্চলভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা দেশের পিছিয়ে থাকা এলাকা, সম্ভাবনাময় খাত এবং বিনিয়োগের সুযোগগুলো আরও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারবো। এর ফলে Balanced Regional Development নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর প্রকল্প গ্রহণ করা সহজ হবে।
বিশেষ অতিথি জনাব এস. এম. শাকিল আখতার, সচিব, পরিকল্পনা বিভাগ বলেন, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নততর অর্থনীতির পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রায় সঠিক, নির্ভুল এবং সময়োপযোগী তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। এই শুমারির মাধ্যমে আমরা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে একটি বাস্তবসম্মত ও বিস্তৃত ধারণা পেয়েছি। বিশেষ করে, অর্থনৈতিক ইউনিটের গঠন, খাতভিত্তিক বণ্টন, কর্মসংস্থান, মালিকানা কাঠামো এবং উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রমের বৈচিত্র্য সবকিছুই আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়নে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। শুমারির ফলাফল বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, দেশের অর্থনীতি ক্রমশ সেবা খাতনির্ভর হয়ে উঠছে, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট এই খাতে সক্রিয়। একইসঙ্গে, বিপুল সংখ্যক মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে আমাদের উন্নয়ন কৌশল হতে হবে উদ্যোক্তাবান্ধব, SME-কেন্দ্রিক এবং কর্মসংস্থানমুখী। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে একটি বেসরকারি খাত-নেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধি (private sector-led growth) মডেলকে উৎসাহিত করছে, যেখানে উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিবিএস-এর মহাপরিচালক জনাব মোঃ ফরহাদ সিদ্দিক বলেন, দেশের টেকসই উন্নয়ন, কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার জন্য নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী পরিসংখ্যান অপরিহার্য। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিয়মিতভাবে অর্থনৈতিক শুমারি পরিচালনা করে আসছে, যার মাধ্যমে দেশের কৃষি বহির্ভূত সকল অর্থনৈতিক ইউনিটের কাঠামো, কার্যক্রম ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে প্রথম অর্থনৈতিক শুমারি ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০০১ ও ২০০৩ সালে দুই পর্যায়ে এবং তৃতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ সালে সম্পন্ন হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৩’ প্রকল্পের আওতায় ১০ থেকে ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ সময়ে দেশের চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারি সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে। এই শুমারিতে দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা, নিয়োজিত জনবল, মালিকানার ধরন, আইনি ভিত্তি, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, উৎপাদিত পণ্য ও সেবার ধরন এবং বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কিত বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, প্রথমবারের মতো Computer Assisted Personal Interviewing (CAPI) পদ্ধতির মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যা তথ্যের গুণগত মান ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।













