একটি রাষ্ট্রের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের বার্ষিক খতিয়ান নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ সামষ্টিক উন্নয়নের এক দূরদর্শী বাস্তবভিত্তিক পরিস্কার পথনকশা। একটি আদর্শ বাজেট তখনই অনন্য ও সফল হয়, যখন তা একদিকে উৎপাদনশীল খাতের বিকাশ ও বেসরকারি বিনিয়োগের গতিশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, তীব্র অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানামুখী সংকটের প্রেক্ষাপটে আগামী জাতীয় বাজেটে এই দুই চালিকাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প ও বাণিজ্য খাত গতিশীল না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়, আবার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হলে সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ বাজারের উৎপাদন চক্রও থমকে যেতে পারে। তাই বর্তমান সময়ের দাবি একটি ব্যবসাবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী সমন্বিত বাজেট।
বর্তমান দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষতগুলো প্রকট হয়ে উঠেছে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য সংকট এবং আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতায়। এই সংকটগুলোর টেকসই নিরসনে বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর সংস্কারমূলক পদক্ষেপ থাকা আবশ্যক।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ধারাবাহিক অবক্ষয় রোধে বাজেটে বিলাসবহুল আমদানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি আয় ও বৈধ পথে রেমিট্যান্স (Remittance) প্রবাহ বৃদ্ধির ফলপ্রসূ কৌশল থাকা জরুরী। হুন্ডি প্রতিরোধের লক্ষ্যে আর্থিক প্রণোদনার হার পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রবাসী আয় প্রেরণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও সহজীকরণ করা প্রয়োজন। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল না হলে শিল্পক্ষেত্রের কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হবে, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারদরে।
অপরদিকে- দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ব্যাংকিং খাত এখন তীব্র তারল্য সংকটে হাহাকার এবং রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের (NPL) বোঝায় জর্জরিত। বাজেটে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইনি সংস্কার এবং শীর্ষ খেলাপিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা শুধু সময়ের দাবি নয়, বরঞ্চ বাস্তবায়নই একমাত্র উপায় মনেকরি। দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ (Merger) প্রক্রিয়াকে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় এনে আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি, অন্যথায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ স্থবির হয়ে পড়ার দুসংবাদ শতভাগ।
👉 আইএমএফ (IMF) এর শর্ত ও ঋণের বহুমাত্রিক প্রভাব
দেশের চলতি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে গৃহীত ঋণের কিস্তি এবং সংস্থাটির সংস্কারমূলক শর্তসমূহ বর্তমান বাজেট প্রণয়নে জনপ্রিয় বাংলা প্রবাদ ‘সেরের উপর সোয়া সের’ এর মতই প্রভাব ফেলবে। তাই বাজেটের সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষায় এই সেসকল শর্তগুলোর কৌশলগত ও যৌক্তিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। নিম্নে তা নির্দেশিত করা হল।-
🔘 ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ
আইএমএফ-এর শর্তানুযায়ী- জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা হচ্ছে। এর ফলে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নির্বাহ খরচ একযোগে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং এ বাজেটে সমস্ত ভর্তুকি প্রত্যাহারের গতি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন তা সাধারণ মানুষের ওপর আকস্মিক কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা না হয়ে দাঁড়ায়।
🔘 রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ও সংস্কার: জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ের অনুপাত (Tax-to-GDP ratio) বৃদ্ধিতে আইএমএফ-এর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এটি পূরণে করের পরিধি সম্প্রসারণের পাশাপাশি শুল্ক ও ভ্যাটের ছাড় যৌক্তিকীকরণ করা হচ্ছে। তবে এই রাজস্ব নীতি যেন কোনোভাবেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপায় এবং দেশীয় উদীয়মান শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।
👉 ব্যবসাবান্ধব নীতি: বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি
ব্যবসাবান্ধব নীতি- বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই। যেমনটি কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দেশীয় শিল্পের যৌক্তিক সুরক্ষা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে ভুমিকা পালন করে। যেমন-
🔘 করের পরিধি সম্প্রসারণ ও প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়করণ
করের হার বৃদ্ধি না করে করের আওতা (Tax Net) বৃদ্ধি করা উচিত। কর প্রদানের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল করলে প্রশাসনিক হয়রানি হ্রাস পাবে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় (Ease of Doing Business) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক করের হার বৈশ্বিক মানদণ্ডের সাথে সংগতিপূর্ণ করা দরকার।
🔘 ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) খাতের বিকাশ: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হলো যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং নতুন উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলোর জন্য প্রথম কয়েক বছর সম্পূর্ণ কর অবকাশ (Tax Holiday) সুবিধা প্রদান করা প্রয়োজন।
🔘 রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও শুল্ক কাঠামো: এককভাবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি (IT), চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিশেষ আর্থিক সুবিধা ও শুল্ক রেয়াত দেওয়া জরুরি। কাঁচামাল আমদানির শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করলে দেশীয় শিল্প বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতা অর্জন করবে।
👉 জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ: সামাজিক সুরক্ষার ঢাল
বাজেটের মূল অভিকেন্দ্রে থাকা উচিত দেশের সাধারণ নাগরিক। তীব্র মূল্যস্ফীতির এই ক্ষণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকোচন করে তাদের পকেটে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেটি সম্ভব হবে নিম্নে প্রদত্ত পদ্ধতি অবলম্বন করলে।-
🔘 মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা: চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে সাময়িকভাবে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার বা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা প্রয়োজন। টিসিবির (TCB) মাধ্যমে ওএমএস (OMS) ও ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের পরিধি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করে প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
🔘 মানবসম্পদ ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ: মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অনুপাত অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা উচিত। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে মানসম্মত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা জরুরি। শিক্ষার আধুনিকায়ন ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বিশেষ তহবিল রাখা প্রয়োজন।
🔘 সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আধুনিকায়ন: প্রবীণ ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা উচিত। এর পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে (Universal Pension Scheme) আরও জনপ্রিয়, নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করতে হবে।
👉 কাঠামোগত সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা
ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি এবং জনকল্যাণের এই ব্লুপ্রিন্ট বাস্তবায়নে কঠোর সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রয়োজন নিম্নে তা প্রদত্ত হল।
🔘 অপচয় রোধ ও সুশাসন: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ADP) অনুৎপাদনশীল ও বিলাসী খাতের প্রকল্প পরিহার করতে হবে। প্রকল্প সময়মতো শেষ না করে অনর্থক মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি বন্ধ করা অপরিহার্য।
🔘 ন্যায্য রাজস্ব আদায়: প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের ওপর জোর দিতে হবে, যেন সম্পদশালীদের কাছ থেকে ন্যায়সংগত কর আদায় করে তা দরিদ্রদের কল্যাণে ব্যয় করা যায়। অন্যদিকে পরোক্ষ কর (VAT), যা ধনী-দরিদ্র সবার ওপর সমভাবে আরোপিত হয়, তা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে তুলে নেওয়া উচিত।
🔘 জ্বালানি ও অবকাঠামোগত স্থায়িত্ব: শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি খাতের লোকসান ও পরনির্ভরশীলতা কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বাজেটে বিশেষ শুল্ক ছাড় ও প্রণোদনা রাখা দরকার।
সর্বশেষ সরকারকে উপলব্ধি করাতে চাই- সেটি হচ্ছে ‘একটি কার্যকর বাজেট কেবল কাগজে পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর আসল সাফল্য প্রতিফলিত করতে হবে মানুষের দৈনন্দিন প্রাত্যহিক জীবনে। ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা কিংবা আইএমএফ-এর শর্তের মতো বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চাপগুলোকে আড়াল না করে, বাজেটে সেগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। দূরদর্শী পরিকল্পনা, দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এবং সঠিক খাতের অগ্রাধিকার বিন্যাসের মাধ্যমেই আগামী দিনের বাজেট দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণের দলিল এবং ব্যবসায়ের টেকসই চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
লেখক পরিচিতি:
অয়ন আহমেদ, সম্পাদক, দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র এবং নিয়মিত কলাম লেখক। মোবাইল নং: ০১৯১৯১১৭১৪৮, ইমেল: protidinerchitro14@gmail.com
অনুরোধ: নিবন্ধনটি প্রকাশের পর ইমেল করলে কৃতজ্ঞ থাকব।












